পুরোনো শ্রমবাজারগুলোতে ক্রমেই কমে আসছে কর্মী প্রেরণের হার

৪৮

পুরনো শ্রমবাজারগুলোতে ক্রমেই কমে আসছে কর্মী প্রেরণের হার। জনশক্তি রপ্তানিতে কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরতা এবং পুরোনো কয়েকটি শ্রমবাজারে কর্মীর চাহিদা না থাকায় পরিস্থিতি আরো খারাপের শঙ্কা রয়েছে। লিবিয়া, কুয়েত, ইরাক প্রভৃতি দেশে কর্মী প্রেরণ একেবারে বন্ধই বলা যায়। তবে জাপান, কোরিয়া এবং ইউরোপের দেশগুলোতে মাইগ্রেশন কূটনীতি বাড়িয়ে ওই বাজারগুলো অনুকূলে আনা সম্ভব। একসময় বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে প্রচুর মহিলা কর্মী গেছে। কিন্তু গত কয়েক বছরে মহিলা কর্মীরা অনেকেই সেখানে যেতে উৎসাহী নয়। ফলে বিদেশে কর্মী প্রেরণের সংখ্যা কমার সঙ্গে সঙ্গে রেমিট্যান্সেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বাংলাদেশ ১৯৭৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত যে জনশক্তি রপ্তানি করেছে তার ৩৩ শতাংশেরও বেশি সৌদি আরবে গেছে। এখনো ওই হার দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু একটি দেশের ওপর অতি নির্ভরতা জনশক্তি রপ্তানিতে বিপদ বাড়ার শঙ্কা থাকে। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো গত দুই বছর ওই দেশটিতে কর্মী পাঠাতে নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে। আর কর্মী পাঠানোর খরচও আগের চেয়ে বেড়েছে। ওই কারণে স্বল্প বেতনের কর্মীরা আর সেখানে যেতে চাচ্ছে না।
সূত্র জানায়, জনশক্তি রপ্তানির প্রধান দেশগুলোতে বাংলাদেশের অন্যান্যের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। বাংলাদেশ জনশক্তি রপ্তানিতে সৌদি আরবের ওপর বেশি নির্ভরশীল। একসময় বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে জনশক্তি রপ্তানি হতো তার অনেক দেশেই এখন তা বন্ধ রয়েছে। ওসব বাজারে নতুন করে জনশক্তি রপ্তানির উদ্যোগ নেয়ার কোনো পদক্ষেপ নেই। রপ্তানিকারকদের মতে, অনেক দেশে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিলে শ্রমবাজার খোলা সম্ভব হতো। ওই লক্ষ্যে বেসরকারি খাতের উদ্যোগ সামান্য কাজ হচ্ছে। লিবিয়া, কুয়েত, ইরাক, জর্ডান প্রভৃতি দেশে জনশক্তি রপ্তানি একপ্রকার বন্ধ। অথচ একসময় এসব দেশে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জনশক্তি রপ্তানি হতো। ২০২১ সালে বাংলাদেশ থেকে লিবিয়াতে গেছে মাত্র ৩ জন কর্মী। এ সময় কুয়েতে গেছে মাত্র ১ হাজার ৮০০ কর্মী। ইরাকে ৫ জন কর্মী চাকরি নিয়ে গেছেন। জর্ডানেও কর্মী যাওয়া কমেছে।
সূত্র আরো জানায়, শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, মালয়েশিয়া এবং ইউরোপের দেশগুলোতেও জনশক্তি রপ্তানি আশানুরূপ নয়। জনশক্তি রপ্তানিতে জাপানের সঙ্গে সরকারের চুক্তি হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ৭০০ থেকে ৮০০ কর্মী সেখানে গেছে। ওই দেশটিতে কর্মী প্রেরণের জন্য ৭০টি রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতিটি ৩০ লাখ টাকা করে সরকারকে জমা দিয়েছে। দেশটির কৃষিখাতে কাজ করার জন্য নেপাল থেকে কর্মী গেলেও বাংলাদেশ অবহেলিত। দক্ষিণ কোরিয়ায় একসময় বাংলাদেশি জনশক্তি প্রচুর গেলেও এখন তা একেবারেই নগণ্য। মালয়েশিয়ায় নানা উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশের জন্য শ্রমবাজার উম্মুক্ত হলেও আশাতীত সফলতা মিলছে না। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে যে গতি আসার কথা সেভাবে গতি ফেরেনি। আর ইউরোপের বাজারেও খুব দুরাবস্থার মধ্যে বাংলাদেশের শ্রমবাজার। একমাত্র ইটালিতে কিছু কর্মী গেলেও বাকি দেশগুলোতে কোনো আশার আলো নেই।
এদিকে বিদেশে কর্মী প্রেরণের হার কমতিতে প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ বা রেমিট্যান্সে চাপ পড়ার শঙ্কা বাড়ছে। ইতোমধ্যে ওই চাপ পড়তে শুরু করেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের সেপ্টেম্বর মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ১৫৩ কোটি ৯৫ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছে। প্রবাসী আয়ের ওই অঙ্ক গত ৭ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। তার আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেশে ১৪৯ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। গত আগস্ট মাসে এসেছে ২০৩ কোটি ৭৮ লাখ ডলার। তার আগের মাসে জুলাইয়ে এসেছে ২০৯ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। আগে প্রতি বছর রেমিট্যান্স প্রেরণের হার বাড়লেও এই প্রথম তা কমতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী ২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ২ হাজার ১০৩ কোটি ১৭ লাখ ডলার। আর ২০২০-২১ অর্থবছরে এসেছে ২ হাজার ৪৭৭ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এসেছে ১ হাজার ৮২০ কোটি ৫০ লাখ ডলার। ২০১৮-১৯ অর্থবছর এসেছে ১ হাজার ৬৪১ কোটি ৯৬ লাখ ডলার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১ হাজার ৪৯৮ কোটি ১৭ লাখ ডলার। শুধু কর্মী কম প্রেরণের কারণে রেমিট্যান্স কমেছে তা নয়। বিদেশে কর্মীরা জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তারা দেশে অর্থ কম পাঠাচ্ছে। মধ্যটও্চ্যের দেশগুলোতে জীবনযাত্রার ব্যয় অন্তত ৩০ শতাংশ বেড়েছে। যার প্রভাব রেমিট্যান্সের ওপর পড়েছে।

এই বিভাগের আরও সংবাদ