খুলনা নামকরণের ইতিহাস ঐতিহ্য

খুলনা

খুলনার সময়: হযরত পীর খাজা খানজাহান আলী (র.) স্মৃতি বিজড়িত ও ভৈরব-রূপসা বিধৌত খুলনার ইতিহাস-ঐতিহ্য গৌরব মন্ডিত। খুলনা নামকরণের উৎপত্তি নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচিত মতগুলো হচ্ছে- ধনপতি সওদাগরের দ্বিতীয় স্ত্রী খুলনার নামে নির্মিত ‘খুলনেশ্বরী মন্দির’ থেকে খুলনা নামের উৎপত্তি। ১৭৬৬ সালে ‘ফলমাউথ’ জাহাজের নাবিকদের উদ্ধারকৃত রেকর্ডে লিখিত Culna শব্দ থেকে খুলনা। অনেক বিজ্ঞজনের মতে ‘কিসমত খুলনা’ মৌজা থেকে খুলনা নামের উৎপত্তি হয়েছে। বৃটিশ আমলের মানচিত্রে লিখিত Jessore-Culna শব্দ থেকে খুলনা এসেছে বলেও অনেকের ধারণা। তবে কোনটি সত্য তা এখনও গবেষণার বিষয়। খুলনা পৌরসভার জন্ম বৃত্তান্তে আসতে গেলে দেখা যায় যে, খুলনা পৌর এলাকা অতীতে জসর (যশোর) জেলার মুরলী থানার অন্তর্গত ছিল। পরে রূপসা নদীর পূর্ব পাড়ে তালিমপুর, শ্রীরামপুর (রহিমনগর) এর কাছে সুন্দরবনের জঙ্গল কেটে নতুন থানা স্থাপন করা হয় এবং এর নাম দেয়া হয় নওবাদ (নয়াবাদ)। কারো মতে এ নতুন থানা ১৭৮১ খ্রিঃ আবার কারো মতে ১৮৩৬ খ্রিঃ সৃষ্টি হয়। ১৮৪২ সালে খুলনা মহকুমার জন্ম হয়। অবিভক্ত বাংলার প্রথম মহকুমা খুলনা। পরে তার পরিধি সম্প্রসারিত হয়ে বর্তমানের খুলনা ও বাগেরহাট জেলা দু’টি নিয়ে ছিল খুলনা মহকুমা। ১৮৬৩ সালে বাগেরহাটে স্বতন্ত্র মহকুমার কার্যালয় স্থানান্তরিত হয়। এরপর ১৮৪৫ সালে সেখানে প্রথম দালান কোঠা ওঠে যা আজকে জেলা প্রশাসকের বাসভবন। খুলনার প্রথম প্রশাসক ছিলেন ডেপুটি মিঃ শোর এবং দ্বিতীয় মহকুমা হাকিম ছিলেন সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি এই বাসভবনে বসে তার উপন্যাস ‘দুর্গেশ নন্দিনী’ রচনা করেছিলেন। পরে ১৮৮২ সালের ২৫ এপ্রিলের সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী খুলনা জেলার জন্ম হয় এবং তৎকালীন যশোর জেলার খুলনা ও বাগেরহাট মহকুমা দুটি এবং ২৪ পরগনা জেলার সাতক্ষীরা মহকুমা নিয়ে ঐ সালের ১ জুন থেকে এ নতুন জেলার কাজ শুরু হয়। প্রথম জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন মি. ডব্লুউ এন ক্লে তার নামানুসারে শহরের ক্লে রোড হয়েছে। খুলনা জেলা শহর হলেও এখানে বেশীদিন আগে জনবসতি গড়ে ওঠেনি। মুলতঃ সুন্দরবনের জঙ্গল কেটে রূপসা ও ভৈরব নদীর পাড়ে জনবসতি গড়ে ওঠে। মূল শহর থেকে কিছুটা দূরে ভৈরব নদীর অপর পাড়ে সেনহাটিতে খুলনার প্রথম জনবসতি গড়ে ওঠে বলে ইতিহাস সূত্রে জানা যায়। ১৮৬৯ সালের ১ এপ্রিল খুলনার প্রথম মিউনিসিপ্যালিটি স্থাপন করা হয় সাতক্ষীরাতে। দ্বিতীয় মিউনিসিপ্যালিটি গঠিত হয় ১৮৭৬ সালে বর্তমান সাতক্ষীরা জেলার দেবহাটায়। তবে ১৯৫৫ সালে সেটি বাতিল হয়ে ইউনিয়ন বোর্ডে পরিণত হয়। জেলার তৃতীয় মিউনিসিপ্যালিটি গঠিত হয় ১৮৮৪ সালে খুলনা শহরে। এর দুই বছর পর ১৮৮৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর মিউনিসিপ্যালিটির দ্বিতীয় সভায় ভাইস চেয়ারম্যান বাবু কৈলাশচন্দ্র কাঞ্জিলালের বাড়ি সত্যচরণ হাউসে সাময়িক ব্যবস্থা হিসাবে মিউনিসিপ্যালিটির অফিস স্থাপন করা হয়। এখান থেকেই মূলত পরিচালিত হতো শহরের প্রশাসনিক কর্মকান্ড। আজ আর সে ভবনের অস্তিত্ব না থাকলেও অনেকের মতে ভবনটি বর্তমান পৌর ভবনের সন্নিকটে ছিল। খুলনা মিউনিসিপ্যালিটির জন্ম বৃত্তান্ত খুঁজতে গিয়ে একশ’ বছর আগের একটি গেজেট থেকে জানা যায়, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে বাংলার লেফটেন্যান্ট-গভর্নর ১৮৭৬ সালের একযাক্ট, ৫(বিসি) এর ৮নং ধারা মতে ১৮৮৪ সালের ১ জুলাই থেকে কয়লাঘাট ও হিলাতলা (হেলাতলা) সহ খুলনা, বানিয়াখামার, টুটপাড়া, গোবরচাকাসহ শিখপাড়া (শেখপাড়া), নুরনাগুর (নুরনগর), চারাবাটিসহ শিববাটি, বারিয়াপাড়াসহ ছোট বয়রা গ্রামসমূহ নিয়ে খুলনাকে ২য় শ্রেণীর মিউনিসিপ্যালিটি করার জন্য ১৮৮৪ সালের ১৮ মে এক বিজ্ঞপ্তি জারী করেন। ঐ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের এক মাসের মধ্যে গ্রহণযোগ্য আপত্তি উত্থাপিত না হলে, প্রস্তাব কার্যকর করা হবে বলে জানানো হয়। ‘দি ক্যালকাটা গেজেটে’ ১৮৮৪ সালের ২৮ মে সংখ্যার ৬৩৮ পাতার মুদ্রিত মিউনিসিপ্যালিটির প্রস্তাবিত চৌহদ্দী ছিল উত্তরে ভৈরন নদী, পূর্বে ভৈরব ও রূপসা নদীসমূহ, দক্ষিণে- মতিয়াখালী খাল এবং লবণচরা খাল এবং মইয়া নদীর উত্তরাংশ এবং পশ্চিমে- বড় বয়রার দক্ষিণ পূর্ব অংশ, গোয়ালপাড়া এবং মুফগুন্নি (মুজগুন্নি)। পরবর্তীতে ১৮৮৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বরের বিজ্ঞপ্তি দ্বারা বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর খুলনাকে মিউনিসিপ্যালিটি ঘোষণা করেন। এ বিজ্ঞপ্তিটি দি ক্যালকাটা গেজেটে ১৮৮৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ৯৫৩ পাতায় মুদ্রিত হয়। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী কারণসম্মত আপত্তি পড়ায় শেখপাড়াসহ গোবরচাকা এবং নুরনগর বাদ দিয়ে কয়লাঘাটাসহ খুলনা, হেলাতলা, বানিয়াখামার, টুটপাড়া, চারাবাচিসহ শিববাঠী এবং বারিয়াপাড়াসহ ছোট বয়রা নিয়ে মিউনিসিপ্যালিটি ১৮৮৪ সালের ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর করা হয়। এ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ১৮৮৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর থেকে খুলনা মিউনিসিপ্যালিটির প্রথম চেয়ারম্যান হিসাবে রেভারেন্ড গগণচন্দ্র দত্ত কার্যভার গ্রহণ করেন। একশ’ ৬৭ বছর আগে ১৮৫৬ সালে কালেক্টর ভবনের পাশে খুলনার প্রথম মসজিদ স্থাপিত হয়। এই মসজিদটি নগরীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ঈদগাহ জামাত স্থল। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম স্থান খুলনা। নদী বন্দর, উন্নত সড়ক ও রেল যোগাযোগ এবং সমতল ভুমির কারণে এ শহরটি প্রসারিত হয়েছে দ্রুতগতিতে। জনবসতি বৃদ্ধির সাথে সাথে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে খুলনার ভুমিকা অগ্রগামী ছিলো।

পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে অন্যদের পড়ার সুযোগ করে দিন।

খুলনার সময়

একটি সৃজনশীল সংবাদপত্র

আমাদের ফেসবুক পেজ

আজকের দিন-তারিখ

  • শনিবার ,রাত ১১:১৬
  • ২৫ মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
  • ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
  • ১৭ জিলকদ, ১৪৪৫ হিজরি

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন